KidsOut World Stories

অহর্ষী দ্য বেঙ্গল টাইগার Abbey Ledger-Lomas    
Previous page
Next page

অহর্ষী দ্য বেঙ্গল টাইগার

A free resource from

Begin reading

This story is available in:

 

 

 

 

অহর্ষী দ্য বেঙ্গল টাইগার

অ্যাবে লেডগার রচিত
একটি বাংলা গল্প

 

 

 

 

 

 

অহর্ষী নামের বাঘটি ভাল চিন্তা করছিল। সেটা শীতকাল ছিল এবং সে তখন তার থাবায় বরফের অনুভূতির সঙ্গে অভ্যস্ত হচ্ছিল। ম্যানগ্রোভের গরম তলতলে কাদার অনুপস্থিতি অনুভব করে, সে সামান্য শিহরিত হল। অহর্ষী অনেক কিছুরই অনুপস্থিতি অনুভব করছিল। কিভাবে সূর্য তার লোমে রাজকীয় কমলা রঙের আভা তৈরি করত,বা মধ্যাহ্নের উজ্জ্বলতার তীব্ররশ্মি কেমন তার কালো ডোরাগুলোকে খুব সপ্রতিভ এবং সবেগে ধাবমান কালো বজ্রের মতো করে তুলত, তার অনুপস্থিতি সে অনুভব করতো। সন্ধ্যেবেলার তাপে ঝিমানো এবং জঙ্গলের দ্রাক্ষালতার মধ্যে দিয়ে খন্ড হয়ে যাওয়া সূর্যের আলোকরশ্মি ধারণ করার অনুপস্থিতি অনুভব করতো। সে ভাবছিল যে সে কী আর কখনো গাছে থাকা দোয়েল পাখির ডাক শুনতে পাবে, বা বাতাসের পাকা আমের গন্ধ অনুভব করতে। এটা হল এমন অস্থায়ী, গ্লানিকর মুহূর্ত যা বাঘটি তার মনের মধ্যে চিত্রিত করে রাখার চেষ্টা করছিল। অহর্ষী তার বাড়ির অনুপস্থিতি অনুভব করছিল।

যেই সে একটি বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার গোঁফ ক্রোধ প্রকাশ করল, দোয়েল পাখির উদ্দেশ্যে যে ধূসর আকাশের দিকে বিক্ষিপ্তভাবে হিমায়িত ভূমি ঠুকরে যাচ্ছিল। তিন ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেছিল, এবং তার তীব্র একাগ্রতা সত্ত্বেও সব বাঘরা কিছুটা আবছাভাবে অর্ধেক আম এবং ম্যানগ্রোভের ছবি মনে করতে পেরেছিল। সে চিন্তিত ছিল যে সে তার পুরোনো বাসস্থানের কথা একসাথে সব ভুলে যাচ্ছে।

অহর্ষী যখন প্রথম ইংল্যান্ডে পৌছালো তার বাবা মায়ের সঙ্গে, সবকিছু খুব রোমাঞ্চকর ছিল। এই সবকিছুকে সে জড়িয়ে রেখেছিল; তার পীতাভো বাদামী রঙের জলন্ত চোখ কৌতুহলের সঙ্গে এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে বেড়াতো বা প্রত্যেক ফুলে গন্ধ নিতো আর প্রত্যেক ছোট পতঙ্গকে থাবা দিয়ে দেখত।

তার মা বলত, 'এখন শান্ত হও, অহর্ষী’। ‘তুমি অনেক দুরে এসেছো। এখনো অনেক সময় আছে অন্বেষণ করার জন্য; এখন তুমি বিশ্রাম কর।’

কিন্তু ছোট বাঘটির তখন বিশ্রাম করার মতো অবসর নেই। সেখানে অনেক নতুন পশু ছিল মেশার জন্য, নতুন গাছ ছিল আরোহণ করার জন্য। তার নতুন বাসস্থান সম্পর্কে অনেককিছু শেখার ছিল। সেই প্রথম দিন সূর্যাস্তের আগে, অহর্ষী সব পশুদের খাঁচার পাশ দিয়ে ঘুর ছিল, তাদের একের পর এক প্রশ্ন করছিল, স্বর্গীয় পাখিগুলোর অদ্ভুত অসাধারণ রঙগুলোকে বিশোষণ করছিল এবং গন্ডারের বাসস্থানের খরের মিষ্টি ও অপরিচিত গন্ধের ঘ্রাণ নিচ্ছিল। কিন্তু সে যত অন্বেষণ করল, তত সে বুঝতে পারল যে সে যেখান থেকে এসেছে তার থেকে এই নতুন বাসস্থান কতটা আলাদা। আর এখন সে চিন্তিত ছিল যে সে তার জন্মভূমির সমস্ত মূল্যবান স্মৃতিগুলোকে হারিয়ে ফেলবে। সে চিন্তিত ছিল যে সে বাংলার বাঘ হওয়ার বিষয়ে সবকিছু ভুলে গেছে।

অহর্ষী তার চোখটাকে হাত দিয়ে বন্ধ করে রাখল এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তার লেজটাকে একপাশ থেকে আরেক পাশে ঝাড়লো। ‘মনে করো,’ সে নিজেকে বলল। ‘দৃঢ়ভাবে ভাবার চেষ্টা করো!’

ঘন্টার পর ঘন্টা অতিবাহিত হল, দিনটা আরো অস্পষ্ট হতে লাগল এবং বাকি পশুরা গোধূলিবেলায় শান্ত হতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর, অহর্ষী অনুভব করল তাকে কেউ একজন দেখছে। তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি পুনরূদ্ধার করার কাজে মনসংযোগ করতে করতে, সে একটি চোখ খুলল। সেটা ছিল জোডি নামের এক চিতাবাঘ।

‘তুমি কী করছ?’ গভীর, গরগরে কন্ঠস্বর আসলো।

‘আমি মনে করতে চেষ্টা করছি,’ অহর্ষী উত্তর দিল। ‘এখন যদি তুমি কিছু মনে না কর...’ অহর্ষী আরো একবার তার চোখ বন্ধ করল এবং আরো দৃঢ়ভাবে মনসংযোগ করার চেষ্টা করল।

‘মনে করার চেষ্টা করছ?’ জোডি জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ। বাংলার বাঘ হওয়ার সব কথা আমি ভুলে গেছি, আর আমি কোথা থেকে এসেছি তাও ভুলে গেছি,তাই সব কিছু ভুলে যাওয়ার আগে আমি মনে করার চেষ্টা করছি। এখন যদি তুমি কিছু মনে না কর...’

আরো একবার অহর্ষী তার চোখ হাত দিয়ে বন্ধ করল এবং জন্মভূমির প্রতিচ্ছবি পুনরায় মনে করার চেষ্টা করল।

‘তুমি তোমার চোখ বন্ধ করে বেশি দূর যেতে পারবে না’ জোডি বলল।

অহর্ষী তার চোখ বড় বড় করে খুলল এবং কিছুটা বিরক্তি নিয়ে তাকালো। ‘তুমি ভাবার জন্য আমাকে একা না ছাড়লে আমি কোথাও যেতে পারব না’ সে বলল। ‘যাইহোক তুমি বুঝবে না, এমনকি তুমি বাঘও না, একজন বাংলার বাঘকে একা থাকতে দাও! তুমি একজন চিতাবাঘ!’

‘তুমি মূর্খ পশু!’ জোডি বলল ঘরঘর করে হাসতে হাসতে। ‘ওদিকে দেখো’ সে শক্ত ভূমির বরফের একটি ঝকঝকে অংশে দিকে তাকাতে বলল।

অহর্ষী কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে জোডির দিকে ফিরে তাকালো। ‘আমার মনে হয় জোডি তুমি একটু বংকার হয়ে গেছ, জোডি,’ সে বলল এবং ঠিক তারপরই সে প্রায় নিজে থেকেই হাসতে চাইছিল।

‘যদি তুমি মনে করতে চাও কিভাবে বাঘ হতে হয়,’ বিনীত কন্ঠে জোডি বলল ‘শুধু দেখো।’

‘বেশ,তুমি যদি আমায় একা ছেড়ে দাও তাহলে আমি দেখবো।’

অহর্ষী তার ঘাড়টা একটু বাঁকালো এবং মাটিতে কাঁচের মতো আয়নায় দৃষ্টিপাত করল। জোডি তার কাঁধের ওপর দিয়ে গরগর আওয়াজ করল।

সে বলল, ‘তোমার কী সুন্দর ডোরা কাটা দাগ আছে।’ ‘যখন আমি আয়নায় দেখি আমি আমার দাগগুলো দেখতে পাই। আমার মতো এরকম দাগ আর কারের নেই। আমার মায়েরও দাগ আছে, এবং আমার মায়ের মারও, আমার মায়ের মায়ের মায়েরও... সারা প্রজন্ম ধরে যখন থেকে আমার ঠাকুমার ঠাকুমার ঠাকুমা দক্ষিন আফ্রিকার ঘাসে বেড়ে উঠেছিল’

অহর্ষী লক্ষ্য করল জোডির চোখ উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে যেহেতু সে সূর্যের তাপে সেঁকা সাভানা এবং তার জন্মভূমির মসৃন সবুজ জঙ্গলের কথা কল্পনা করছে। ‘যখন আমি আমার দাগগুলো দেখি,’ সে বলতে থাকল, ‘আমি আমার সম্পূর্ণ ইতিহাস দেখতে পাই। আর আমার সবসময় দাগগুলো থাকবে।’ সে অহর্ষীর দিকে তাকিয়ে চোকের পলক ফেলল। ‘মোটের ওপর,’ সে বলল, ‘একজন চিতাবাঘ তার দাগগুলো কখনো রূপান্তর করে না!’

‘কিন্তু তুমি আর কখনো নিজের দেশের জন্য কাতর বা দুঃখিত হও না?’ ‘এখানে সবকিছু একদম আলাদা।’

‘আমরা সবাই এখানে নিজের দেশে ফেরার জন্য কাতর হয়ে যাই,’ বরফের মধ্যে থাবা দিয়ে জোডি উত্তর দিল, ‘কিন্তু এখানে আমাদের প্রতিবিম্বের দিকে দেখো। আমরা কিন্তু খুব একটা আলাদা নই। তুমি পাকিস্থান থেকে আর আমি আফ্রিকা থেকে, কিন্তু দেখ আমাদের গোঁফগুলো একইরকমের। আর এখানে দেখ...’ জোডি তার ধারালো নখ দিয়ে বরফের মধ্যে একটা গভীর খাঁজ কাটল এবং তারপর সেটাকে ওপরে তুলল যাতে সেগুলো আবছা আলোয় চকচক করে। ‘আমাদের দুজনের কাছেই এটা আছে,’ অল্প হাসির সঙ্গে সে বলল।

ঠিক তখনই একটা বিশাল ভেঁপু বাজানো শব্দ চিড়িয়াখানার পূর্বদিকের কোনের হাতিদের থাকার জায়গায় থেকে শোনা গেল।

‘বেশ, এটা এমন কিছু আশ্চর্যজনক নয়,’ অহর্ষী বলল। ‘আমরা দুজনেই বিড়ালজাতীয়। কিন্তু ওইখানে ওই হাতিগুলোর মতো নই, আমি কী..?’

জোডি মুখ চেপে হাসলো। ‘তারা হয়তো আলাদা দেখতে এবং আলাদা ধরনের শব্দ করে, কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি তারাও নিজের দেশের জন্য কাতর হয়। এটাই একমাত্র তোমাদের মধ্যে সাদৃশ্য।’

অহর্ষীকে অনিশ্চিত দেখালো যখন সে যে হাতিরা এত বড় ও শক্তিশালী তারা কখনো দুঃখিত হতে পারে না। ‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি তারা কোথা থেকে এসেছে তা মনে করতে পারে,’ সে বলল। ‘আমার মা বলেছিল যে হাতিরা কখনো কিছু ভুলে যায় না।’

জোডি হিসহিস ধ্বনি করল এবং মুখ চেপে হাসলো আর শক্ত ভূমির মধ্যে গড়াগড়ি খেল। ‘তা ঠিকই!’ সে সম্মতি জানাল। ‘একজন হাতি কখনো ভুলে যায় না!’

‘এবং আমি বাজি ধরে বলতে পারি একজন জেব্রা কখনো ভয় পায় না,’ অহর্ষী বলতে থাকল যতক্ষণ না তার বন্ধুরা রঙ্গভঙ্গে তার গোমড়ামুখে হাসতে শুরু না করে।

‘তুমি কী কখনো তাদের চিড়িয়াখানার রক্ষকদের ট্রাক্টরের থেকে ছুটে পালাতে দেখোনি?’ জোডি জিজ্ঞেস করল।

‘ আর... আর ওই কুমিরগুলো? তারাও কী ভয় বা দুঃখ পায়?’ অহর্ষী জিজ্ঞাসা করলো
‘তুমি কী ওদের কখনো জলের তলায় লোকাতে দেখোনি?’ জোডি তার নাক দিয়ে তার বন্ধুকে আচমকা ধাক্কা দিয়ে উত্তর দিল। ‘আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় নিজের জন্মস্থানের

অনুপস্থিতি অনুভব করি, অহর্ষী। কিন্তু তার জন্যই আমরা সবাই আলাদা দেখি। আমরা আলাদা তাই আমরা মনে করতে পারি। আমার দিকে তাকাও। আমার এই সুন্দর লেজটা আছে যা আমাকে মনে করায় যে আমরা চিতাবাঘরা হলাম উঁচু গাছে সবথেকে ভালো ভারসাম্য রক্ষাকারী।’

অহর্ষী অনেক ভালো অনুভব করছিল এবং খুব তাড়াতাড়ি গভীর গর্জন করতে শুরু করল। ‘আর আমারও সবসময় আমার ডোরা কাটা দাগগুলো থাকবে লম্বা ঘাসে লোকানোর জন্য। সমস্ত পাকিস্থানে আমরা বাঘেরাই হলাম সবথেকে ভালো শিকারী।’

‘তুমি যেখানেই যাও তোমার ডোরা কাটা দাগও তোমার সাথে সেখানে যাবে,অহর্ষী,’ জোডি হাসতে হাসতে বলল।

‘আর যখন হাতিরা দুঃখ অনুভব করবে তারা তাদের শুড়ের দিকে দেখবে তারা যে সবথেকে ভালো জল ছেটাতে পারে তা মনে করার জন্য,’ অহর্ষী বলল। ‘আর যখন কুমিররা দুঃখ অনুভব করবে তারা তাদের লিপ্তপদাঙ্গুলিগুলো দেখবে এবং মনে করবে যে তারা নদীর সবথেকে দ্রুততম জীব...’

ছোট বাঘটি সামান্য লেজ নাড়লো, তার চোখ ভারি হয়ে আসছিল আর লক্ষ্য না করেই হাই তুলল। তখন সন্ধলেবেলা ছিল এবং অগুন্তি পশুর গাঁ গাঁ শব্দে চিড়িয়াখানাটি সজীব ছিল। কোথাও রঙিন, কোথাও তিলকিতভাবে। তাদের মধ্যে একজনও আরেক জনের মতো ছিল না। যেই রাত্রি হল এবং লক্ষ লক্ষ তারা আকাশ ছেয়ে ফেলল, অহর্ষী বুঝতে শুরু করল সব পশুরাই আলাদা, তারা সবাই কখনো কখনো একরকম অনুভব করে। এটা হল সেই সময় যখন সে জানত সে কখনোই একা হবে না, এবং সে জানত সে সবসময় তার জন্মভূমিকে তার হৃদয়ে বহন করবে। 

Enjoyed this story?
Find out more here