লায়লা ও মজনুর গল্প
A free resource from
KidsOut - the fun and happiness charity
This story is available in:
This story is available in:


কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়াহ যখন গভীরভাবে লায়লা আল-আমিরিয়ার প্রেমে পড়েছিল তখন সে একটি বালক মাত্র। স্কুলে লায়লার ওপর যেদিন তার প্রথম নজর পড়ে সেদিনই সে বুঝতে পেরেছিল যে সে আসলেই প্রেমে পড়ে গেছে। সে লায়লাকে নিয়ে প্রেমের সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখতে শুরু করে এবং রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে আগ্রহী মানুষদেরকে সে তা শোনাত। ভালোবাসার প্রতি এ ধরনের গভীর অভিব্যক্তি দেখে অনেকে ছেলেটিকে মজনু বা পাগল বলে অভিহিত করে।
একদিন মজনু অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে লায়লার বাবার কাছে তাঁর মেয়ের সাথে নিজের বিবাহের প্রস্তাব রাখে। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি কারণ দেখান এই বিবাহ কেবল কেচ্ছা রটাবে। যাকে সকলে পাগল মনে করে, তার সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না। এর পরিবর্তে লায়লাকে অন্য কারো সাথে বিয়ে দেবেন বোলে প্রতিজ্ঞা করেন।
মনের দুঃখে মজনু পরিবার-পরিজন ছেড়ে বনে চলে যায়। বন্য প্রাণীদের মধ্যে নিঃসঙ্গ করুণ জীবন কাটাতে শুরু করে এবং তার প্রাণের লায়লাকে নিয়ে কাব্য রচনায় মগ্ন থাকে। লায়লাকে জোর করে অন্য একজনের সাথে বিয়ে দেয়া হলেও সে লোকটিকে ভালোবাসত না কারণ সে তার মন মজনুকে সমর্পণ করেছিল। আর এজন্যই সে কেবল স্ত্রী হিসেবে কর্তব্য করে গিয়েছিল।
এই বিবাহের সংবাদ মজনুকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে ফেলে। এ কারণে সে নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নেয় এবং শহরে মা বাবার কাছে ফিরে আসার প্রস্তাবও প্রত্যাখান করে।
মজনুর বাবা-মা তাঁদের ছেলের অনুপস্থিতি ভীষণভাবে অনুভব করতেন এবং প্রতি মুহূর্তে চাইতেন তাঁদের ছেলে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসুক। তারা মজনুর জন্য জঙ্গলের প্রান্তে খাবার রেখে দিতেন এই আশায় যে সে একদিন ওই রুক্ষ প্রান্তর থেকে বাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু মজনু বনের মধ্যে রয়ে গেল, একাকী কবিতা লিকে যেতে থাকল এবং কারো সাথে কখনোই কথা বলত না।
সেই অসীম রুক্ষ জনহীন প্রান্তরে মজনু একাকিত্বের জীবন কাটাতে লাগল। যেখানে কেবল বন্য জন্তুরাই তাকে আড়াল করে রাখত আর দীর্ঘ কঠোর রাত্রিগুলোতে তাকে সঙ্গ দিত। যে সব পর্যটকরা ওখান দিয়ে শহরের দিকে যেতেন, তাঁরা প্রায়ই মজনুকে দেখতে পেতেন। পর্যটকরা বলতেন নিজের মনে কবিতা আবৃত্তি করেই মজনু তার দিন কাটাত আর একটা লম্বা লাঠি দিয়ে বালির ওপরে লিখে যেত। তারা মনে করেছিলেন ভগ্নহৃদয়ই মজনুকে উন্মত্ততার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অনেক বছর পরে মজনুর বাবা-মা দুজনেই প্রয়াত হলেন। বাবা-মায়ের প্রতি মজনুর গভীর টানের কথা জানা থাকায় এই প্রয়ানের কথা মজনুকে জানাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হল লায়লা। শেষ পর্যন্ত লায়লা একজন বৃদ্ধ মানুষের খোঁজ পেল যে ওই রুক্ষ প্রান্তরে মজনুকে দেখেছে। অনেক অনুনয় বিনয়ের পর বৃদ্ধ লোকটি রাজি হলেন এই শর্তে যে যখন আবার তিনি সে দিক দিয়ে যাবার সময় ওই শোকবার্তা পৌঁছে দেবেন।
একদিন ওই মরু প্রান্তরে বৃদ্ধ ব্যক্তির সঙ্গে মজনুর দেখা হয়ে গেল। তখন তিনি ভারাক্রান্ত মনে মজনুকে তার বাবা-মার মৃত্যু সংবাদ জানালে তিনি বুঝতে পারলেন যে এই বার্তা কি ভীষণভাবে ওই তরুণ কবিকে আঘাত করেছে।
শোকে দুঃখে মুহ্যমান মজনু নিজেকে বাইরের জগৎ থেকে পুরোপুরি বিছিন্ন করে ফেলল এবং তার মৃত্যু পর্যন্ত ওই মরু প্রান্তরে থেকে যাওয়ায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রইল।
কয়েক বছর পরে লায়লার স্বামীর মৃত্যু হল। এবার ওই তরুণী নারীর মনে প্রত্যাশা জাগল যে অবশেষে সে তার সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষের সাথে থাকতে পারবে; এবং চিরদিনের জন্য একত্রে দিন যাপন করবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা সম্ভবপর হল না। কারণ সামাজিক প্রথা অনুযায়ী লায়লাকে তার স্বামীর শোক পালনের জন্য নিজ গৃহে অন্য কোন মানুষের দৃষ্টির বাইরে থেকে একলা পুরো দুটি বছর কাটাতে হবে। কিন্তু মজনুকে ছাড়া আর দুটি বছর কাটানোর চিন্তাটাই লায়লার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল। জীবনের অনেকটা সময়ই তারা বিচ্ছিন্ন থেকেছে, এরপর আরও দুটি বছরের নিঃসঙ্গতা, আর দুটি বছর তার একান্ত ভালোবাসার মানুষটিকে না দেখতে পারার যন্ত্রণা, তার বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই হারিয়ে গেল। নিজ গৃহে একাকী আর কোনদিন মজনুকে না দেখার বেদনা নিয়ে ভগ্ন হৃদয়ে চিরবিদায় নিল লায়লা।
সেই জনহীন মরু প্রান্তরে মজনুর কাছে লায়লার মৃত্যু সংবাদ পৌঁছানো মাত্র লায়লাকে যেখানে হয়েছিল, সেখানে মজনু পাগলের মতো ছুটে গেল। এই অসহনীয় দুঃখে মজনু তার চোখের পানি একটি বারের জন্যও চোখের পানি আটকাতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত সে তার সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষের কবরের পাশেই মারা যায়।
‘আমি লায়লার বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাই
আর তার দেওয়ালগুলিকে চুম্বন করি,
তবে বাড়িগুলো আমার ভালোবাসার বস্তু নয়,
ভালোবাসা শুধু তার জন্যই, যে একসময় এই বাড়িগুলোতে বাস করেছে।’
Enjoyed this story?