অভিশাপ
A free resource from
KidsOut - the fun and happiness charity
This story is available in:
This story is available in:
একটি পর্তুগিজ গল্প

*
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা, বিরাট এক বনের ধারে একটি ছোট্ট গ্রাম ছিল। গ্রামটি বেশির ভাগ সময়ই বেশ শান্তিপূর্ণ ছিল, তবে গ্রামবাসীরা লবিজনদের ভয়ে তটস্থ থাকতো। সবাই বলাবলি করতো, লবিজনরা বনের গহীনে বাস করে। এই লবিজনরা আঁধারের প্রাণী, অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক নেকড়ে, এবং বলা হতো প্রতি পূর্ণিমায় তারা মানুষের মাংসের খোঁজে বন থেকে বেরিয়ে আসে।
কিন্তু এমন প্রাণী কীভাবে থাকতে পারে? খুব সহজ: প্রতি পরিবারের সপ্তম পুত্রের ওপর থাকা অভিশাপ। এই অভিশাপ কোনো কন্যার ওপর পড়বে না, তবে কোনো মা যদি সাত পুত্র জন্ম দেয়, এই সন্তানদের সপ্তমজন নিশ্চিতভাবেই লবিজন হবে।
ফিলিপের জন্মের সময় তার মা ভীত হয়ে পড়েন। তিনি একটি মেয়ের আশা করছিলেন, সপ্তম ছেলে নয়, তবে তিনি দয়ালু আর স্নেহপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন এবং তিনি তাঁর আপন সন্তানের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবেন না, ওই অভিশাপ সম্পর্কে গ্রামবাসীরা যেটাই বলুক না কেন।
অনেক বছর শান্তিতে কেটে গেল। ফিলিপ শক্তিশালী এক বালক হিসেবে বেড়ে উঠলো, তাকে তার মা, বাবা আর ছয় ভাই খুব ভালোবাসতো। তবে ফিলিপ এটা খেয়াল করছিল যে, তাকে তার বাকি ছয় ভাই থেকে অন্যভাবে দেখা হতো। সে স্কুলে যেতো না, কারণ শিক্ষকের এতে অনুমতি ছিল না। এটা মোটেও তার উপর সুবিচার হতো না , কারণ সে নতুন কিছু শিখতে খুব ভালোবাসতো আর অন্য বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে অনেক উদগ্রীব ছিল।
যদি ফিলিপকে তার মা কখনো পাউরুটি আনতে পাঠাতো, তখন গ্রামের মানুষ কেউ তার পথ মাড়াতো না আর সব সময় তার দিকে ভয় আর বিরক্তি নিয়ে তাকাতো, এটা ওকে ভয় পাইয়ে দিত। অন্য বাচ্চারা তার সাথে খেলতো না আর পূর্ণিমার সময় তাকে কখনোই বাগানে বেরোতে দেয়া হতো না।
এই শেষ ব্যাপারটা সম্ভবত তার কাছে সব থেকে বাজে লাগতো কারণ ফিলিপ চাঁদ খুব ভালোবাসতো - বিশেষত রাতের আকাশে যখন পূর্ণিমার চাঁদ গোল হয়ে দেখা দিত - চাঁদ যেন ওর সাথে কথা বলতো, ওকে আনন্দিত করতো আর ওকে গান গাইতে, নাচতে আর খুশিতে দৌড়াতে উৎসাহ দিতো।
যদিও শান্তিতেই জীবন কেটে যাচ্ছিল, তবে তাকে সুখী বলা যাবে না। প্রতিটি বছর যাবার সাথে সাথে ফিলিপ নিজেকে আরো একা হিসেবে আবিষ্কার করতে লাগলো। তার কোনো বন্ধু ছিলনা, এবং কখনো অন্য বাচ্চাদের সাথে তাকে খেলতে আমন্ত্রণ জানানো হতো না। ও মাঝে মাঝে অন্যদের হাসি শুনতে পেতো আর ওরা কি খেলছে আর কতো আনন্দ করছে সেটা অনুমান করার চেষ্টা করতো।
ফিলিপ এটাও বুঝতে পারলো যে তার মা এবং তার ভাইরাও তার দিকে অন্য রকম ভাবে তাকাতে শুরু করেছে।
ফিলিপ মাঝে মাঝেই নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতো, “আমার এতো সমস্যাটা কিসের?” আমি তো অতোটা খারাপ ছেলেও নই। আমি নিজের সব কাজ করি আর প্রায় কখনোই খারাপ আচরণ করি না। আমাকে কেন অন্য ছেলেমেয়েদের থেকে আলাদা করে দেখা হয়?”
ফিলিপের পনেরোতম জন্মদিন যত কাছে আসতে লাগলো, আর ফিলিপের মন তত খারাপ হতে থাকলো।
তার মা তাকে খুব কমই বাড়ির বাইরে বেরোতে দিতেন আর ফিলিপের সান্নিধ্যে তাঁকে প্রায়ই বিচলিত মনে হতো। নিজে নিজে বাড়ির পাশে খেলা করবার সময় দুষ্ট ছেলেরা দেখতে পেলে তার দিকে প্রায়ই পাথর ছুঁড়ে মারতো, কিন্তু সে যদি রুখে দাঁড়াতো তাহলে ওরা দৌড়ে পালিয়ে যেতো, যেন সে কোনো এক দানব। মাঝে মাঝে ফিলিপের বড় বনের ভেতর পালিয়ে গিয়ে আর কখনো না ফিরে আসার ইচ্ছে হতো।
একদিন তার মা তাকে বসিয়ে তার ঝঞ্ঝাটের কারণ ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বললেন, “তুমি আমার সপ্তম পুত্র, আর তোমার উপর অভিশাপ আছে, বাবা।”
ফিলিপ বিভ্রান্ত হয়ে প্রশ্ন করলো, “কি ধরণের অভিশাপ?”
“তোমার পনেরোতম জন্মদিনে তুমি লবিজনে রূপান্তরিত হবে । লবিজন হচ্ছে এক ধরণের প্রাণী যার অর্ধেকটা মানুষ আর অর্ধেকটা নেকড়ে”
ফিলিপ লবিজন সম্পর্কে সবই তার বই থেকে জানতো আর জানতো, রাতে সে ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে তার ভাইদের বলা গল্প থেকে ।
তবে তারা কখনো বলেনি যে ফিলিপ এভাবে অভিশপ্ত। সে লবিজন হতে চায় না । সে খারাপ আর নিষ্ঠুর হতে চায় না, আর লম্বা নখ আর সারা শরীরে পুরু পশমের ব্যাপারটা নিয়ে সে একটু বিভ্রান্ত ছিল।
পনেরোতম জন্মদিনে ফিলিপ তার পুরো জীবনে সব থেকে বেশি মন খারাপ করেছিল। অন্ধকারে সে তার বিছানায় বসে একা একা কাঁদল। ও ভাবল, “আমি সব সময়ই একা ছিলাম। আমাকে সব সময় অন্য রকম ভাবে দেখা হয়েছে। এখন লবিজন হবার অভিশাপ আছে আমার ওপর। কী করবো আমি? আমি তো শুধু আর সবার মতো করে একসাথে থাকতে চেয়েছিলাম। আমি তো শুধু বন্ধুদের সাথে বনে খেলতে আর রাতে সুন্দর চাঁদ দেখে মুগ্ধ হতে চেয়েছিলাম।”
তখনই ফিলিপ তার শোবার ঘরের জানালা দিয়ে তারায় ভরা গাঢ় নীল আকাশে চাঁদ উঠতে দেখলো। বিরাট বড় সেই পূর্ণিমার চাঁদ তার মন আনন্দে ভরিয়ে দিল। তখন কিছু অদ্ভুত ব্যাপার শুরু হলো। ফিলিপের পেটে কেমন মোচড় দিতে থাকলো, আর সারা শরীরে কেমন যেন চুলকাতে থাকলো। তার বুকের ভেতর থেকে গর্জন বেরিয়ে এলো আর চাঁদের দিকে মাথা তুলে চাঁদকে আহ্বান করতে লাগলো, যেটা ও আগে কখনোই করেনি।
তার সারা শরীরে লোম বেরিয়ে এলো, সাথে হাতের আর পায়ের নখগুলো সাদাটে নখরে পরিণত হলো। তার জামা ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে পায়ের কাছে মেঝেতে পড়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফিলিপ সারা শরীরে ঘন লোম আর আঁধারে জ্বলতে থাকা বুনো লাল চোখের লম্বা নেকড়ে-বালককে তাকিয়ে থাকতে, দেখতে পেল।
সে বিস্মিত হয়ে বললো, “তাহলে আমি এখন লবিজন!”
ফিলিপ চাঁদের আহ্বান অনুভব করতে লাগলো এবং বুঝতে পারলো যে পুরনো জীবন ছেড়ে নতুন ভাগ্যকে বরণ করবার সময় এটি।
তরুণ নেকড়ে বালক তার শোবার ঘরের জানালা খুললো। রাতের আঁধারে লাফিয়ে পড়ার আগে সে শেষ বারের মতো একটু থেমে তার পুরনো শোবার ঘরটা দেখে নিল, নিজের মা, বাবা আর ছয় ভাইয়ের কথা ভাবলো। “আমি তোমাদের সব সময় মনে করবো, প্রিয় পরিবার, তবে এখন আমাকে, নিজেকে গ্রহণ করে নিতে হবে আর এক নতুন জীবন শুরু করতে হবে।”
তারপর জানালা গলে বাইরে লাফ দিয়ে বনের দিকে ছুটে গেল, পুরোটা সময় সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে গর্জন করে গেল আর ভবিষ্যত নিয়ে অচেনা নতুন আশায় তার বুক ভরে গেল।
ফিলিপ যখন বড় বনের গহীনে চলে এলো, প্রাচীন গাছ আর আকাশে সুন্দর চাঁদের আলোয় একটা চমৎকার ফাঁকা জায়গায় এসে সে থামলো। সে একটানা গর্জন করেই গেল, সাথে লাফিয়ে নেচে হাসতে থাকলো … যখন অবশেষে সে গর্জন আর নাচ থামালো, চারদিকে তাকিয়ে অন্য লবিজনদের সেই ফাঁকা জায়গায় জড়ো হতে দেখতে পেল। এদের কেউ ফিলিপের মতো তরুণ, আর কেউ বয়স্ক।
তারা ফিলিপের কাছে এসে তাকে বরণ করে নিল।
একটি নম্রকণ্ঠ জানালো, “তুমি এখন নিজ নিবাসে ,এই বিরাট বনে, বন্ধুদের মাঝে।” আর তখন ফিলিপ বুঝতে পারলো যে, সে মোটেও অভিশপ্ত নয়।
পূর্ণিমার চাঁদের দিকে মাথা তুলে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে গর্জন করতে করতে সে হেসে জানাল, “আমি একজন লবিজন আর আমি এখন আমার নিজ নিবাসে !” অন্য লবিজনরাও তার সাথে যোগ দিল।
চাঁদের সম্মানে রাতের আকাশে সম্মিলিত কণ্ঠের গর্জন পৌঁছে দিলো।
অনেক মাইল দূরে ফিলিপের মা রাতের পোশাক পরে বাগানে দাঁড়িয়ে বিরাট বনের দিক থেকে মৃদু বাতাসে ভেসে আসা লবিজনদের সম্মিলিত কণ্ঠ শুনছেন। তাঁর সপ্তম পুত্র অবশেষে তার নিজের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে, যেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে এবং যেখানে সে অনেক বন্ধু আর দীর্ঘ আনন্দময় জীবন পাবে - এই ভেবে বৃদ্ধা নিজের মনে হাসলেন।
Enjoyed this story?